মুর্শিদাবাদের জৈনমন্দির: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

কখনও এই বাংলার মাটিতে শুধু নবাবদের ইতিহাসই লেখা হয়নি…লিখে গেছে আরেকটি নীরব সভ্যতা।

এমন এক সম্প্রদায়… যারা যুদ্ধ নয়, শান্তিকে বেছে নিয়েছিল। ক্ষমতা নয়, ত্যাগকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল।
আর রেখে গেছে অসাধারণ কিছু মন্দির… যেগুলো আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।

এটি… মুর্শিদাবাদের জৈনমন্দিরের গল্প।


জৈনধর্মের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। জৈনদের মতে, মানবজাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন চব্বিশ জন তীর্থঙ্কর। এই তীর্থঙ্করদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত পার্শ্বনাথ এবং শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর। বুদ্ধের সমসাময়িক মহাবীর ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে বিহার ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন বাংলার রাঢ় অঞ্চলেও।

ভাগীরথীর তীর পর্যন্ত তাঁর সেই যাত্রা… বাংলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ধীরে ধীরে রাঢ় বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে জৈনধর্মের প্রভাব। আর সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়… মুর্শিদাবাদে।


আজ থেকে প্রায় আটশো বছর আগে…ডিহি কিরীটকোনার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল এক প্রাচীন জৈন মন্দির—জৈনেশ্বরের মন্দির। দ্বাদশ কিংবা ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত সেই মন্দির একসময় ছিল জৈন উপাসনার প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু ইতিহাস কখনও স্থির থাকে না। সপ্তদশ শতকে সেই মন্দির স্থানান্তরিত হয় আজিমগঞ্জে।

একটি মন্দিরের এই যাত্রা যেন ইতিহাসেরই প্রতীক—যেখানে সময় বদলায়, স্থান বদলায়… কিন্তু বিশ্বাস থেকে যায় অটুট।


এক সময় কাশিমবাজার ছিল বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানেই বাস করতেন অসংখ্য ওসওয়াল জৈন ব্যবসায়ী।তাদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি ব্যাংকার…জগৎশেঠ।

মুর্শিদকুলি খাঁর আমন্ত্রণে তিনি ঢাকার পরিবর্তে চলে আসেন মুর্শিদাবাদে।তৈরি করেন প্রাসাদ…তৈরি করেন মন্দির।

গুজরাটে একটি প্রবাদ আজও শোনা যায়—

জৈননু, চুনা মা।

“জৈননু, চুনা মা।”

অর্থাৎ…জৈনরা মন্দির নির্মাণে অর্থ ব্যয় করতে কখনও কার্পণ্য করেন না। আর সেই কারণেই আজও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য শিল্পসমৃদ্ধ জৈনমন্দির।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জৈন সম্প্রদায় কাশিমবাজার ছেড়ে চলে আসে জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জে। আজও এই দুই শহরে বাস করেন দুগার, সিংঘী, নাহাটা, কোঠারীসহ বহু জৈন পরিবার। জিয়াগঞ্জে রয়েছে পাঁচটি ঐতিহাসিক জৈনমন্দির।
আজিমগঞ্জে রয়েছে আটটি।

সম্ভবনাথ…
নেমিনাথ…
সুমতিনাথ…
শান্তিনাথ…
পদ্মপ্রভু…

প্রতিটি মন্দিরই যেন এক একটি শিল্পকীর্তি। সম্ভবনাথের আট ফুট উচ্চতার বিগ্রহ…
নেমিনাথের সুদৃশ্য মন্দির…জগৎশেঠের প্রতিষ্ঠিত তীর্থঙ্কর মল্লিনাথ, ঋষভদেব ও পার্শ্বনাথের বিগ্রহ… সব মিলিয়ে এই অঞ্চল যেন বাংলার বুকে এক অমূল্য জৈন ঐতিহ্যের ভাণ্ডার।


মুর্শিদাবাদের জৈনমন্দির শুধু একটি ধর্মের স্মারক নয়…এগুলো বাংলার শিল্প, স্থাপত্য, বাণিজ্য এবং সহাবস্থানের ইতিহাস বহন করে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।আজও সুদূর গুজরাট, রাজস্থান কিংবা ভারতের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তরা এসে মাথা নত করেন এই মন্দিরগুলোর সামনে। হয়তো এই কারণেই…সময়ের ঝড়, রাজনীতির পরিবর্তন,
অসংখ্য ইতিহাসের উত্থান-পতনের পরেও…মুর্শিদাবাদের জৈনমন্দির আজও দাঁড়িয়ে আছে…নিঃশব্দে…অটলভাবে…
ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *